আজ গল্প করবো কিভাবে আমরা পৌঁছালাম স্বপ্নের কাশ্মীরে ?? ২০০৫ সাল থেকে আমি কলকাতার এক হসপিটালে চিকিৎসা সেবা নিয়ে আসছি এবং প্রতি বছরই যাওয়া হয় মেডিক্যাল চেক আপের জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে মেডিক্যাল ভিসার জন্য আমি এবং আমার ওয়াইফ নাঈমা সুলতানা আবেদন করি এবং আল্লাহর রহমতে ভিসা পেয়ে যায়। ভিসা পাওয়ার পর মাথায় ভূত চাপলো কাশ্মীর যাব এবং আমার কাশ্মীরের বন্ধু ভাট আসিফ প্রতিনিয়ত আমাদের কাশ্মীর যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানাতো। ভিসা পাওয়ার পর যখন আসিফকে বললাম আমরা কলকাতা যাবো তখন আসিফ বললো তোমরা যদি কাশ্মীর আসতে পারো তাহলে তোমাদের আমার গাড়ীতে নিয়ে প্রচুর ঘুরাঘুরি করবো এবং আমরা যেখানে যাবো সেখানে নিজেদের মতো রান্না করে খাব। সত্যি কথা বলতে এমন অফার শুনে আমি সিদ্ধান্ত নিতে ১ মিনিট দেরি করিনি। অনেকেই বলেছেন ভারতে মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে কাশ্মীর গেলে প্রবলেম হবে কিন্তু আমি জানতাম এটা সম্ভব কারন ভারতের সকল টুরিষ্ট স্পটগুলোতে তখন প্রচুর পরিমাণ টুরিষ্টদের উপস্থিতি। আর আসিফ যখন বললো কাশ্মীর এই বছরের শুরুতে সর্বোচ্চ পরিমাণ ইন্ডিয়ান টুরিষ্ট রিসিভ করেছে তখন আমি কনফিডেন্ট ছিলাম আমি পারবো।
আমরা বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ ২১) রাতে শ্যামলী এন আর পরিবহনে ঢাকা থেকে কোলকাতার উদ্দেশ্য রওনা হয়ে পরের দিন শুক্রবার দুপুর ১টায় কোলকাতায় পৌঁছায় এবং সরাসরি চলে যায় পিয়ারলেস হসপিটালে। আমার আগে থেকেই ডাক্তারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ছিল একই দিন অর্থাৎ শুক্রবার দুপুর ২টায়। হসপিটালে পেমেন্ট শেষ করে যখন ডাক্তারের চেম্বারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম তখনই দেখি আমার নাম ধরে ডাকছেন। সাথে সাথে রুমের ভেতরে গিয়ে ডক্টরকে দেখালাম এবং স্যারকে বললাম আমি কাশ্মীর যাব আজ রাতে ফ্লাইট। এই ডাক্তার সাহেবের কাছে বিগত ১৬ বছর ধরে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছি এবং স্যার আমাকে খুব স্নেহ করেন। ডাক্তার সাহেব ২০-২৫ মিনিটের মত টাইম নিলেন এবং বললেন কাশ্মীর থেকে ফিরে বৃহস্পতিবার উনার সাথে আবার দেখা করতে।
আমরা হসপিটাল থেকে বের হয়ে রাস্তার অপরদিকে একটা হোটেলে উঠি কিছু সময় রেষ্ট নেওয়া জন্য। ঘুম হলো না তাই বিগ বাজারে গিয়ে সময় কাটালাম এবং রাত ৯টায় ওলা অ্যাপসের কারে চড়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এয়ারপোর্টে চলে যায়। শনিবার রাত ১২.৩০ মিনিটে স্পাইসজেটের ফ্লাইটে চড়ে আমার দিল্লী ইন্দিরা গান্ধী এয়াপোর্টের টার্মিনাল-০৩ তে যখন পৌঁছালাম তখন রাত ৩টা বাজে। দিল্লী থেকে শ্রীনগরের সকল ফ্লাইট টার্মিনাল-০২ থেকে ছাড়ে তাই আমার প্রথমে টার্মিনাল-০৩ থেকে প্রায় ১৫-২০ মিনিট হেঁটে টার্মিনাল-০২ তে পৌঁছালাম। আমাদের শ্রীনগরের ফ্লাইট ছিল সকাল ৬.৩৫ মিনিটে, প্রায় সারে তিন ঘন্টা লেওভার টাইম। এই সময়ে দিল্লী এয়ারপোর্টে একটু ঘুরে দেখা, গল্প, গান আর কফির সাথেই কাটানো লেগেছিল। ইন্ডিগো বরাবরের মতো অন টাইমে ফ্লাইট টেক অফ করলো এবং ঠিক ৮টায় আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা শ্রীনগর এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম। শ্রীনগর এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করার আগে হিমালয়ের অসাধারণ ভিউ দেখে আমাদের চোখ থেকে ঘুম পুরোপুরি একদম পালিয়ে গিয়েছিল এবং কেমন জানি একটা চাঙ্গা ভাব চলে আসেছিল আর আল্লাহর কাছে বার বার শুকরিয়া আদায় করছিলাম। লাগেজ কালেক্ট করার পর CRPF আমাদের ফরেনার ডেস্কে যেতে বললেন এবং সেখানে গিয়ে কিছু ফর্ম ফিল আপ করে আমাদের পাঠানো হলো ফ্রীতে RT PCR ল্যাবে কোভিড টেষ্টের জন্য স্যাম্পল জমা দিতে। এতদিন শুধু টাকা দিয়ে টেষ্ট করেছি আর কাশ্মীরে এসে ফ্রীতে কোভিড টেষ্ট করলাম। উনারা আমার বন্ধু আসিফের মোবাইল নাম্বার নিল এবং বললো যদি পজিটিভ রিপোর্ট আসে তাহলেই শুধু জানিয়ে দিবে ঐ নাম্বারে। এয়ারপোর্ট এই সকল ফর্মালিটিজগুলো শেষ করতে একটুকু খারাপ লাগেনি কারন যখন আমারা বলেছিলাম আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি তখন তারা আমাদের অনেক সন্মান ও সহযোগীতা করেছিলেন।
এয়ারপোর্ট থেকে রের হয়ে দেখলাম আসিফ ও তার অংকেল (মোজাফফর ওয়ানি) কিছু নার্গিস ফুল হাতে নিয়ে আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আসিফের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে করে তার গাড়ীতে উঠে বসি এবং পেহেলগামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আসিফকে বললাম আমরা নাস্তা করবো এবং সে বললো পথে একটা জায়গাতে কাশ্মীরি ট্রেডিশনাল ড্রিংকস কেহওয়া ও শিরমাল দিয়ে নাস্তা করবো। কেহওয়া (Kehwa) যেটা অনেকটা গ্রীন চায়ের মত দেখতে কিন্তু ভেতরে স্যাফরন ও আলমন্ড দেওয়া থাকে। আমরা কিছু দূর যাওয়া পর আসিফ বললো রাস্তার বাম পাশে যা দেখছো সবগুলো স্যাফরন (Saffron) ফিল্ড । আমি সাথে সাথে গাড়িটা থামাতে বললাম এবং কিছু সময় ধরে নিজের চোখ দিয়ে উপভোগ করলাম।
স্যাফরন ফিল্ড পার হয়েই একটা ছোট রেস্টুরেন্টে গাড়ি রাখলো আমাদের মোজাফফর ওয়ানি অংকেল। গাড়ি থেকে নেমে আমরা পান করলাম বিখ্যাত কেহওয়া আর সাথে খেলাম শিরমল নামক একরকমের বিস্কুট জাতীয় শুকনো খাবার। নাস্তা শেষে রওনা হলাম অপরুপ সুন্দর সাইট ভিউ দেখতে দেখতে। কিছুক্ষণ যাবার পর রাস্তায় দুপাশে সারি সারি আপেল বাগান দেখলাম এবং সেখানে একটু ব্রেক নিয়ে পান করলাম তাজা আপেলের হ্যান্ড মেইড জুস। এমন ফ্রেশ আপেলের জুস আর কখনো খেয়েছি কিনা মনে পরেনা। আবার আমরা যাত্রা শুরু করলাম পেহেলগামের উদ্দেশ্যে, সারারাত ঘুম নেই কিন্তু এতটুকু ক্লান্তি ছিলনা মনে, কাশ্মীরের সৌন্দর্য্য আর ঠান্ড ওয়েদারে আমারা ভূলেই গিয়েছিলাম গতকাল রাতে একদম ঘুমহীন ছিলাম। ঘন্টাখানেক যাবার পর আমরা লিডার রিভারের উপর অবস্থিত লাংগালবাল ব্রীজটির সামনে থামলাম এবং কিছু ছবি ও ভিডিও ধারন করলাম। সামনে পাহাড়ের চূড়ায় সাদা বরফ, পাহাড়ের গায়ে দাড়িয়ে আছে সারি সারি সবুজ পাইন গাছ, নিচে খরোস্রোতা লিডার নদী আর স্বচ্ছ পানি সবকিছু মিলে মিছে যেন একাকার হয়ে আছে। আমরা শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে উপভোগ করেছি আর আল্লাহর কাছে বার বার শুকরিয়া আদায় করেছি। আবার রওনা দিয়ে ১৫ মিনিট পরেই চলে গেলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য পেহেলগামে। পেহেলগামকে বলা হয় ল্যান্ড অফ শেফার্ড, আমারা পেহেলগাম পৌঁছেই আমাদের হোটেলে চেক ইন করেছিলাম। হোটেল রুমে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে রিতিমত হতবাক হয়ে যায় ভিউ দেখে। এত সুন্দর সাইট ভিউ রুমে বসে বসে দেখবো ভেবে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা পেহেলগামে দুপুর ১২ দিকে পৌঁছায় এবং প্রথম দিনটি পেহেলগামের আশেপাশেই ঘুরাঘুরি করি। রাতে আমরা নিজেরাই রান্না করে ডিনার শেষে তারাতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি।
পরের দিন রবিবার আমরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পেহেলগামের অপার্থিব সৌন্দর্য্য উপভোগ করি। সকালের নাস্তা শেষ করে আমরা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড যায় চন্দনওয়ারী, বেতাব ভ্যালী ও অরু ভ্যালী যাবার জন্য একটা এটিওস কার ভাড়া করতে। আমরা দুপুর ১টা পর্যন্ত তিনটি স্পট ঘুরে অরু ভ্যালীতে দুপুরে রান্না করে লিডার নদীর তীরে একসাথে বসে লাঞ্চ করেছিলাম। এমন অসম্ভব সুন্দর একটা জায়গাতে বসে এভাবে লাঞ্চ করতে পারবো এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। লাঞ্চ শেষ করে আমরা পনি ভাড়া করলাম মিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত বাইসারান ঘুরতে যাওয়ার জন্য। বাইসারান ঘুরে আমারা যখন পেহেলগামে পৌঁছায় তখন মাগরিবের আজান দিচ্ছিল। আমরা সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিটে পেহেলগাম থেকে রওনা দিয়েছিলাম শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে এবং রাত ৯.৩০টায় আমার শ্রীনগর পৌঁছে হোটেলে চেন ইন করি।
বাকি গল্প করবো সামনের পর্বে |